আলোড়ন নিউজ
Lead News মুক্তমত

‘মাছের পচন ধরে মাথা থেকে আর যুবলীগের পচন ধরেছে নেতা থেকে’

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাও সেতুংয়ের এ প্রবাদবাক্যটি ওমর ফারুক চৌধুরীর মতো  অযোগ্য নেতার হাতে ধ্বংসস্তুপে পরিণত হওয়া যুবলীগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বহুল বিতর্কিত যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর নেতৃত্বকালকে ‘বিভীষিকার কাল’ বলছেন সংগঠনটির নেতারা।

এতদিন ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত ছিলেন তিনি প্রধানমন্ত্রীর ফুফাতো বোনের এবং যুবলীগ প্রতিষ্ঠাতা শেখ মনির ভগ্নিপতি বলে। রাষ্ট্রীয় পদে না থাকলেও রাষ্ট্রের অক্ষয় শক্তি মনে করতেন নিজেকে। সেই শক্তির ক্ষয় নয়, ধ্বংস হওয়ায় মাঠের কর্মীরা তার নৈতিক স্খলনজনিত কুকর্মের ফিরিস্তি তুলে ধরছে।

দাপুটে নেতারাও যারা তার অকথ্য ও অশ্লীল শব্দোচ্চারণের শিকারে পরিণত হন, স্বস্তিতে ফিরেছেন। তারা চোখে কান্নার সাঁতার কেটে মুখে হাসির ফোয়ারা ছড়িয়ে এতদিনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

আগামী ২৩ নভেম্বরের কংগ্রেসে ওমর ফারুক চৌধুরীর মুখও দেখতে চান না নেতারা। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে নানা অভিযোগ করেছেন বিনয়ের সঙ্গে।  প্রধানমন্ত্রীর চলমান শুদ্ধি অভিযানকে স্বাগত জানান নিরীহ নিষ্প্রাণ হয়ে পড়া যুবলীগ সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ।

নেতার সুচিন্তার প্রতিফলন ঘটে কর্মে আর কর্মই শেষমেষ নেতৃত্বের পরিধি বিস্তৃত করে। ঠিক এর উল্টোটি করেছেন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী। প্রথমে তিনি প্রেসিডিয়ামের সদস্য পদটি বাগিয়ে নেন গালভরা হাসি দিয়ে। তার বিনয়সুলভ আচার-আচরণের মধ্যে কে জানতো লুকানো ছিল, চরম তামাশা আর বদ চিন্তা! তিনি কুরুচিপূর্ণ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যই যুবলীগের চেয়ারম্যান পদটিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেছেন।

তার কর্মে ফুটে উঠে “সর্বোচ্চ হাইকমান্ড” সম্পর্কেও ছিলেন উদাসীন। হয়তো তার মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মেছিল যে,  প্রধানমন্ত্রীর অনুকম্পা সর্বদাই পাবেন-কেননা  ফুফাতো বোন তার সহধর্মিণী। এই কারণে জনসমক্ষে বলেছেন,“বিপদে পড়লে বউ ছাড়া কেউ থাকে না।”

দেশ-জাতির কল্যাণের প্রশ্নে ব্যক্তি বিশেষকেও যে জলাঞ্জলি দিতে পারেন, তা জাতির পিতার কন্যার চোখে আঙুল দিয়ে দেখালেন। ঔদ্ধত্যমূলক বয়ান টিভিরপর্দায় ও সংবাদপত্রে যারা দেখেছেন তারা ওমর ফারুক চৌধুরীর নিষ্ঠুর পরিণতিই আঁচ করছিলেন। তিনি খোশগল্পে প্রবাদবাক্য টানতেন। বলতেন, প্রবাদবাক্যকে ইংরেজিতে বলে  epigram কিংবা বুদ্ধিদীপ্ত মন্তব্য।

তার বুদ্ধিদীপ্ত মানসিকতার অনিচ্ছাকৃত একটি উদাহরণ আমি দেই। যুবলীগ কংগ্রেস। ’০৯ সালে জাহাঙ্গীর কবির নানক আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হয়েছেন। যুবলীগের চেয়ারম্যান পদে মীর্জা আযমের সঙ্গে ওমর ফারুক চৌধুরীর নামও আসল। বাংলাদেশ প্রতিদিন আমার কর্মস্থল। দায়িত্ব পড়ল তার সঙ্গে কথা বলে একটা প্রতিবেদন তৈরি করার। প্রথম কলামে তার ছবিসহ একটি সাক্ষাৎকারধর্মী প্রতিবেদন ছাপা হল। বুকজুড়ানো আদুরে ওমর ফারুক চৌধুরী শুনিয়ে ছিলেন আশারবাণী। বললেন, চেয়ারম্যান হলে “আপনাকে” সদস্য হতে পদোন্নতি দিব সম্পাদকমন্ডলীতে।। দারুণ লিখেন, আপনার মেধা ও প্রতিভা যুবলীগের কাজে লাগাব। কিন্তু কংগ্রেসের দিনই আমার সম্ভাবনার মৃত্যু ঘণ্টা শুনতে পেলাম। বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রথম কলামে  “আবারও মীর্জা আযম” শীর্ষক একটি প্রতিবেদন লেখার দায়ে। ফোনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন তিনি। কংগ্রস অনুষ্ঠানে দেখা হতেই রীতিমতো শাসালেন।

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে মীর্জা আযম। চেয়ারম্যান পদে কাউন্সিলরদের ভোট হলে তারই নিরঙ্কুশ বিজয় হতো। হাইকমান্ডের সবুজ সঙ্কেতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নেতাকর্মীদের অকৃপণ ভালোবাসা ও অশ্রুজলপ্রপাতের স্রোতে নিজেকে ভাসাতে হল মীর্জা আযম বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে। ওমর ফারুক চৌধুরী চেয়ারম্যান হলেন।  শুভেচ্ছা জানাতে হাজির হলাম যুবলীগের কার্যালয়ে। তিনি দেখেই চেঁচিয়ে উঠলেন, বললেন যুবলীগ করতে হলে ১০ লাখ টাকা খরচ করতে হবে। সেই টাকা দেওয়ার ক্ষমতা আপনার নেই। অতএব আপনারও বিদায়। সাংবাদিক হওয়ায় হয়তো সেদিন সরাসরি স্টুপিট না বললেও ঘুরিয়ে বলেছিলেন “স্টুপিটের মতোই কাজটি করেছেন”।

পদ পাওয়া না পাওয়া নিয়ে কষ্ট হয়নি বিন্দুমাত্র। কিন্তু তার মানসিকতার সঙ্কীর্ণতা ও দৈনতা দেখে সেদিন ব্যথিত হয়েছিলাম। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে কাজ করার সময়ে এ ধরনের পরিস্থিতির কখনও মুখোমুখি হতে হয়নি। যুবলীগ করার ইচ্ছাও ছিল না। বঙ্গবন্ধু কন্যাই আওয়ামী লীগের প্রথম কেন্দ্রীয় উপকমিটিতে স্থান দিয়ে উপরে ওঠার সিঁড়ি তৈরি করে দেন। ’০৩-এ যুবলীগের কংগ্রেসে ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক চেয়ারম্যান হলেন। আমাকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য করেন।

ভালো উদ্দেশ্য থাকা ভালো, কিন্তু সে উদ্দেশ্যকে কাজে পরিণত না করলে তার কি মূল্য আছে? কাজ করার আগে যে চিন্তা করে তাকে পস্তাতে হয় না, যুবলীগ চেয়ারম্যান হয়ত সেটি ভুলে গিয়েছিলেন। একটা মিথ্যা ধারণার কথা বারবার বললে মন সেটা বিশ্বাস করে নেয়। ওমর ফারুক চৌধুরী বিশ্বাস করতে চাননি যে, যত বড় বড় চিন্তা করেন না কেন, কাজ না করলে ফলাফল শূন্য। তার সহকর্মীরা যা বিশ্বাস করতে চাননি, তাই তিনি বিশ্বাস করাতে চেয়েছেন। সফল সেই নেতা যে সহকর্মীদের আশা-বিশ্বাস নষ্ট করার চেষ্টা করেন না। মনে সাহস আছে কিন্তু ভয় নেই -প্রকৃতপক্ষে সেই সফল নেতা।

সাফল্যের অন্যতম পথ যেখানে সহকর্মীদের জাগ্রত করা, সেখানে যুবলীগ চেয়ারম্যান ব্যস্ত ছিলেন শোষণের হাতিয়ার দিয়ে স্বীয় কর্তৃত্বকে জাহির করতে। এক লাফে বা এক চেষ্টায় শীর্ষে ওঠার চেষ্টা করলে নীচের দিকেই নামতে হয়, ওমর ফারুক চৌধুরীই তার প্রমাণ। তার অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাওয়ায় হিতাকাঙ্ক্ষীদের সংখ্যা এখন শূন্যের কোঠায়। নেতৃত্বে উঠে আসার ক্ষেত্রে আত্মীয়-পরিজন সূত্র হতে পারে, কিন্তু মাপকাঠি হতে পারে না। যুবলীগ প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনিই এক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বঙ্গবন্ধু-শেখ মনি মামা-ভাগনে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে কখনো ‘মামা’ বলে সম্মোধন করতেন না। বঙ্গবন্ধুও বাড়তি সমীহ দেখাননি। ছাত্রলীগের দু’বারের সভাপতি শাহ মোয়াজ্জেমের সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক হিসাবেই শেখ মনিকে জুটি বাঁধতে হয়েছিল।

সোহেল সানি, লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

Related posts

ফিরলেন মাহমুদউল্লাহ, ব্যাটিং বিপর্যয়ে বাংলাদেশ

sms

গৌরীপুরের দেওয়ান আহাদুজ্জামান খান হলেন ঢা. ম. উত্তর ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি

Ashish Mallick

ভুঁইফোড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল মোকাবেলা করবেন তথ্যমন্ত্রী

Ashish Mallick

Leave a Comment

* By using this form you agree with the storage and handling of your data by this website.