আলোড়ন নিউজ
আন্তর্জাতিক

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের মন্তব্য

প্রভাবশালী মার্কিন পত্রিকা ওয়াশিংটন পোস্ট বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সোমবার একটি বিশ্লেষণমূলক সম্পাদকীয় প্রকাশ করেছে। এতে নির্বাচনের ফলাফলের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেন ওয়াশিংটন পোস্টের ইন্ডিয়া ব্যুরো চিফ জোয়ানা স্লেটার।

স্লেটার বলেন, রোববার বিশ্বের অষ্টম জনবহুল দেশ বাংলাদেশে গত এক দশকের মধ্যে প্রথম প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু এর ফলাফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কোনও আভাসই পাওয়া যায়নি। ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার জোট সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয় লাভ করেছে। িএই ব্যবধানের জয় – ৯৬ শতাংশ- উত্তর কোরিয়ার মতো দেশে আশা করা যায়, বাংলাদেশের মতো গণতান্ত্রিক দেশে নয়।

এটাই হচ্ছে সমস্যা: ক্রমশ স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠা বাংলাদেশি নেতা হাসিনা তার ক্ষমতাকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত করেছেন কিন্তু এতে তার নির্বাচন সংক্রান্ত বৈধতাকে মূল্য দিতে হয়েছে, মন্তব্য করেন স্লেটার।

বিরোধী দল এই ভারসাম্যহীন ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। ‘আমরা ইলেকশন কমিশনকে এই প্রহসনের নির্বাচন বাতিল করার আহ্বান জানাচ্ছি এবং নতুন নির্বাচন দাবী করছি,’ বলেন কামাল হোসেন। এই আইনজীবী ও হাসিনার আওয়ামি লীগের সাবেক সদস্য বিরোধীদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তবে সোমবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার নতুন নির্বাচনের দাবী নাকচ করে দিয়েছেন। তার বদলে এই ফলাফল হাসিনার ক্ষমতায় থাকার ফর্মুলাই প্রয়োগ করে যাওয়ার পথ তৈরি করবে এই ফলাফল: শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচকদের দমন।

শেখ হাসিনা (৭১) বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতির কন্যা। দেশটিতে ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯১ সাল থেকে দেশটিতে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে গণতান্ত্রিক নির্বাচন, যাতে পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে হাসিনার আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি (বিএনপি)।

বাংলাদেশের নির্বাচন কোনও শান্তিপূর্ণ ঘটনা নয়। দুই প্রধান দলের সমর্থকরা প্রায়ই রাস্তায় সহিংসতায় লিপ্ত হয় এবং রোববার কমপক্ষে ১৭ নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশের মুখপাত্র।

নির্বাচনে হাসিনা জিতবেন বলে বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞ অনুমান করলেও এমন বিরাট নিরঙ্কুশ বিজয় প্রায় কেউই আশা করেননি। এমনকি, গত ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়েও ভালো করেছে হাসিনার আওয়ামী লীগ। ওই বছর বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করায় অনেক জায়গায় মাত্র একজন প্রার্থী ছিলেন।

ভোটকে প্রভাবিত করাসহ ভোট কেন্দ্রগুলোতে অনিয়মের বিভিন্ন খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু পর্যবেক্ষকরা বলছেন হাসিনা তার অনুকুলে ফলাফল পাওয়ার আশায় অন্যান্য উপায়ও অবলম্বন করেছেন।

বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণার সময় সহিংসতা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন; বিএনপি বলছে তাদের এক ডজন প্রার্থীকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় বিরোধী দলের প্রার্থীদের পোস্টার প্রায় দেখাই যায়নি।

শেখ হাসিনা সোমবার ভোট প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছেন এবং বিরোধী দল আরও সক্রিয় ভাবে প্রচারণা না চালানোয় তিনি বিস্মিত, জানায় রয়টার্স।

একই সময়ে, বাংলাদেশের ভোটাররা কঠিন এক সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছে। হাসিনা বিরুদ্ধমতের প্রতি ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন এবং ক্ষমতা ছাড়ার কোনও লক্ষণই দেখাচ্ছেন না, কিন্তু তিনি একটি বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির তত্ত্বাবধান করছেন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছেন। মিয়ানমারের গণহত্যা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের জন্য দেশের দরজা উন্মুক্ত করে দিয়ে তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন।

ভারতসহ কেউ কেউ হাসিনাকে ইসলামি চরমপন্থিদের সম্ভাব্য বিস্তার রোধে বিরোধী জোটের সহযোগী বলে মনে করে।

প্রধান বিরোধীদল বিএনপি এখন বিশৃঙ্খল অবস্থায় আছে। তাদের নেতা খালেদা জিয়াকে – যিনি হাসিনার সাবেক প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী – দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। অক্টোবর মাসে তার ছেলেকে, যে এখন ব্রিটেনে থাকে, আরও উনিশ জনের সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। ২০০৪ সালে হাসিনাকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে এই সাজা দেয়া হয়।

রোববারের নির্বাচনের পর বাংলাদেশ একটি ‘একদলীয় গণতন্ত্রের দেশে’ পরিণত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন নতুন দিল্লীভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাঞ্চন গুপ্ত। হাসিনা ‘যোগ্য কোনও বিরোধীর মোকাবেলা করছেন না’, বলেন তিনি।

এই ব্যাপক বিজয় নির্বাচনের সুষ্ঠুতা নিয়ে ‘গুরুতর সন্দেহের’ জন্ম দিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন আতাউর রহমান, বাংলাদেশ পলিটিকাল সায়েন্টিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বিরোধী দলের সামান্য সংখ্যক আসন থাকায় রাজনৈতিক নির্ভরতার কোনও উপায়ই থাকবে না।

এক্টিভিস্ট ও সাংবাদিকরা একটি ভীতিকর আবহাওয়ার বর্ণনা দেন, যেখানে সরকারের সমালোচনার পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। সেপ্টেম্বর মাসে হসিনার সরকার নতুন ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা’ আইন পাশ করেন যাতে বিশেষ ধরনের ‘প্রোপাগান্ডার’ জন্য জেলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই আইন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করবে বলে মন্তব্য করেছেন সম্পাদকরা।

বাংলাদেশে ‘উন্নয়নের গল্প ঊর্ধ্বমুখী এবং গণতন্ত্রের গল্প নিম্নগামী’, মন্তব্য করেন দীর্ঘদিন ধরে দেশটির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছেন এমন এক ব্যক্তি। তবে দেশের রাজনৈতিক আবহাওয়ার কারনে তিনি তার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক।
প্রখ্যাত ফটোগ্রাফার শহিদুল আলমকে আগস্ট মাসে গ্রেফতার করে তিন মাস কারাবন্দী করে রাখা হয়। সড়ক-নিরাপত্তার দাবীতে ব্যাপক আন্দোলনের ঢেউয়ের বিষয়ে ‘উস্কানিমূলক’ মন্তব্য করার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

‘যদি কারও স্বাধীনতা হরণ সবচেয়ে বড় শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে পুরো জাতিই সর্বক্ষণ এই শাস্তি পাচ্ছে,’ সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন শহিদুল আলম। ‘এটা উন্নয়নের মূল্য হতেই পারে না, এমনকি এটা উন্নয়নের সংজ্ঞাই হতে পারে না,’ বলেন তিনি।

Related posts

করোনা আতঙ্কে ইউক্রেনে চীন ফেরতদের ওপর হামলা

Ashish Mallick

সোমালিয়ায় গাড়ি বোমা বিস্ফোরণে নিহত ১১

Ashish Mallick

তুরস্কে মুরসির গায়েবানা জানাজায় হাজারো মানুষের প্রার্থনা

Mostafij Rahman

Leave a Comment

* By using this form you agree with the storage and handling of your data by this website.