আলোড়ন নিউজ
Lead News জাতীয় রাজনীতি সারাদেশ স্বাস্থ্য

আব্বু একটা স্বাধীন দেশ উপহার দিছে, সেই দেশের হয়ে একটা আইসিইউ দিতে পারলেন না

নিজস্ব প্রতিবেদক:  চট্টগ্রাম হাসপাতালে চিকিৎসার অভাবে গত শুক্রবার (১২ জুন) মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমানের মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন টানা নয় ঘন্টা ধরে একের পর এক হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে ৬ষ্ঠ তম হাসপাতালের বারান্দায় একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যু, যা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের বিবেক নাড়া দিয়েছে। শুধু বিবেক নড়ে নি অমানবিক হাসপাতালগুলির।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাও। তার পৈতৃক নিবাস  ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবিনগর থানার রতনপুর গ্রামে। বর্তমানে আবাস্থল হিসেবে চট্টগ্রামস্থ  ডবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদ নাজিরপুল এলাকায়।

গত ১২ জুন চট্টগ্রামের নিজ বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে দুপুর  দুইটার দিকে এ্যাম্বুলেন্স করে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে রওনা হন পরিবারজনরা। প্রথমত নগরীর পার্কভিউ হাসপাতালে, দ্বিতীয়ত  মা ও শিশু হাসপাতালে , তৃতীয়ত  ম্যাক্স হাসপাতালে ছুটাছুটি করে। পরপর তিনটি হাসপাতালে ভর্তি না নেওয়ার কথা বললে এক পর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমানের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে মারিয়া তাহা  সন্ধ্যা ৭ টা ৩৫ মিনিটে তার মুমূর্ষু বাবার জন্য একটি আইসিইউ বেড ম্যানেজ করে দেওয়ার আকুতি জানিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন।


ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে থেমে নেই। পরিবারজনরা ছুঁটতে থাকে সার্জিস্কোপ হাসপাতালে, এরপরে হলি ক্রিসেন্টে। কোথাও ঠাই হচ্ছে না মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া এই মুক্তিযোদ্ধার । এর মধ্যে মারিয়া তাহা তার ফেসবুকে দেয়া পোস্টে কিছু সময় পর পর কমেন্ট চেক করতে থাকে। এ বুঝি কেউ  আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা জানাল। কিন্তু ফেসবুকে তেমন কোন আশার বাণী ফেলেন নি। এরপরেও থেমে নেই পরিবারজনরা।

সর্বশেষ শক্তি দিয়ে রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্যে ছুঁটে চলেছে নগরের  শেভরণ হাসপাতালে। তাতে কোন লাভ হয়নি। এর মধ্যে স্বজনরাও যে যার অবস্থান থেকে পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতা, চিকিৎসক নেতাসহ অনেকের কাছেই ফোনে একজন মুক্তিযোদ্ধার জন্য একটি আইসিইউ বেডের ব্যবস্থার জন্য আকুতি মিনতি করেন। কিন্তু তাতেও কোনো কাজ হয়নি।

পরিশেষে এগোতে থাকে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া পরিবারের অভিভাবককে নিয়ে  চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সবার চেষ্টায়ও যেহেতু একটা আইসিইউ বেডের ব্যবস্থা হলো না, সেহেতু  মারিয়া তাহা আবারো ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকে আরেকটা স্ট্যাটাস দেন। ইতিমধ্যে মনে হচ্ছে বাবার জন্য আকুতি মিনতি চেয়ে দ্বারে দ্বারে ব্যর্থ হয়ে তার জানা হয়ে গেল, বাবাকে বাঁচানোর আর কোন উপায় নেই। তাই তো স্ট্যাটাসে লিখেছেন, লাগবে না ICU . আর।  এই অসুস্থ রোগীর জীবন বাঁচাতে এ হাসপাতাল থেকে ঐ হাসপাতাল করে মোট সাতটি হাসপাতালের দ্বারে গিয়েছে। অবশেষে বিনা চিকিৎসায় রাত ১১ টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন রণাঙ্গনে বাজি রেখে যুদ্ধ করা মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান।

এই পরিবারের সার্বক্ষণিক পাশে থাকা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের নেতা মুহাম্মদ হুসাইন পাভেল এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আলোড়ন নিউজকে বলেন যখন কোনো হাসপাতালে নেওয়া হয় তখন বুকে ব্যাথা শুনলেই রোগী ভর্তি না নিয়ে অসহযোগিতা করে এবং আইসিইউ খালি থাকার পরও পুরোপুরি অস্বীকার করে।

টানা নয় ঘন্টা এই বীর মুক্তিযোদ্ধা যাতে একটু শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে পারেন তার জন্য সহযোগিতা চেয়ে জনপ্রতিনিধি, পুলিশ, চিকিৎসক নেতা এমন কারো কাছে ফোন করতে বাকি রাখি নাই । দুঃখের বিষয় জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের জীবন বাঁচাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। মৃত্যুর পর অবশ্য রাষ্ট্রীয় ভাবে সম্মান জানিয়ে দাফন কার্য্য সম্পন্ন হয়েছে।

শোকাহত পরিবারের সদস্যদের একটাই কথা জীবন বাজি রেখে লড়াই করে যে দেশ স্বাধীন করল সেই দেশেই চিকিৎসকদের অবহেলা ও অসহযোগিতার ফলে মৃত্যুকালে একটু আইসিইউ সুবিধা না পেয়ে হাসপাতালের বারান্দায় মরতে হলো আমার বাবাকে। এর চেয়ে অত্যন্ত দুঃখজনক আর কী হতে পারে বলে চোখের অশ্রু ভাসতে থাকে ছেলে মুহাম্মদ হোসাইন পাভেলের।

মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদ কমান্ডের সভাপতি ও আওয়ামী লীগের মুক্তিযোদ্ধা উপকমিটির সদস্য মেহেদী হাসান বলেন, স্বাস্থ্য সেবা দানকারী সকল প্রতিষ্ঠান মনে হয় এখনও স্বাধীন হয়নি পাকিস্তানি বেনিয়াদের হাতেই আছে। তাই ওরা আমাদের স্বাধীন বাংলার মানুষের অসুস্থতাকে নিয়ে তামাশা করছে যার জরুরী বিহিত হওয়া অত্যাবশ্যক ।

তিনি বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার চারপাশের বর্ণচোরাদের সরিয়ে ফেলুন অন্যথায় আমাদের বিশ্বাস ধরে রাখা অনেক কষ্টকর হয়ে পড়বে।জাতির এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত ও মর্মাহত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড ও মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের পক্ষ থেকে মরহুমের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা সহ শোক শন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করার ছাড়া কিছুই যে করার নেই।

এ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কেন্দ্রীয় সংসদের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আওয়ামী লীগের উপকমিটির সদস্য তসলিম উদ্দিন রানা বলেন , দেশ স্বাধীন করা লোক আজ চিকিৎসার অবহেলায় মৃত্যু তা মেনে নেওয়া যায়।তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও ক্ষতিকর। চট্রগ্রামে মনে হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল চলছে । গত এক সপ্তাহ ধরে এই মরহুম মুক্তিযোদ্ধাসহ,  আওয়ামী লীগ নেতা -কর্মী, অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও নানান পেশাজীবি মানুষেরাসহ সাধারণ জনগণও হয়তো  অক্সিজেন সংকটে, না হয়তো আইসিইউ সংকটে , না হয় একেবারে নিত্যদিনের  হাসপাতালে ভর্তি না করার অভিযোগ নিয়ে অনেক আপনজন ও চেনাজনকে হারাতে হয়েছে। এটা বীর চট্টলার প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ।কিছুদিন আগে মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম চিকিৎসা না পেয়ে মৃত্যুবরন করেন এরুপ কত মানুষ মারা যাচ্ছে তার ইয়ত্ত নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আকুল আবেদন অনতিবিলম্বে চট্রগ্রাম চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি নজর দিয়ে সিন্ডিকেট মুক্ত করে চট্রগ্রামবাসীকে বাঁচাতে । আমরা আর এ ধরণের ঘটনা দেখতে চায় না।

উল্লেখ্য, বুধবার (১০ জুন) মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমানের হালকা জ্বর ও শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। পরদিন হঠাৎ করে বেড়ে যায় শ্বাসকষ্ট। বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় পরিবারের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয় নগরের সিএসসিআর হাসপাতালে। ভর্তির আশ্বাস পেয়ে সেখানে তাকে নিয়ে যান স্বজনরা। কিন্তু রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পর শ্বাসকষ্ট দেখামাত্রই মুখ ফিরিয়ে নেয় সিএসসিআর। মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিলেও সে জীবগুলোকে পাত্তাই দেয়নি হাসপাতালটি।

 

Related posts

আন্জুমানে আশেকানে মোস্তফা (দঃ) রসিদাবাদ এর উদ্দ্যোগে শোহাদায়ে কারবালা মাহফিল অনুষ্টিত

Ashish Mallick

সুন্দরবন-১০ লঞ্চে আগুন

Ashish Mallick

সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বিশেষ অভিযানে ২৩ বোতল ফেন্সিডিল ও ১০০ পিচ ইয়াবা উদ্ধার

Ashish Mallick

Leave a Comment

* By using this form you agree with the storage and handling of your data by this website.